কীভাবে আবিষ্কৃত হয়েছিল বিদ্যুৎ?
কীভাবে আবিষ্কৃত হয়েছিল বিদ্যুৎ?
1780 র দশকে ইতালিতে এক ডাক্তার একটা মরা ব্যাঙ কাটছিলেন। কিন্তু হঠাৎ ছুরি ছোঁয়াতেই ব্যাঙের পা লাফিয়ে উঠলো।
কিন্তু কেন? এই একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মানুষ আবিষ্কার করে ফেলেছিল এমন এক শক্তি যা আবিষ্কার না হলে আজকের পৃথিবী প্রায় কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে থাকতো। কিন্তু কি সেই শক্তি বিদ্যুৎ? কিন্তু ব্যাঙের এই ঘটনাটা তো গল্পের প্রায় শেষের দিকের।
আসল ঘটনা শুরু হয়েছিল তারও অনেক আগে। ভাবুন আজ থেকে প্রায় 2600 বছর আগের একটা পৃথিবী। তখন রাত নামলেই চারপাশ ঢেকে যেত ঘন অন্ধকারে। আজকের মত বৈদ্যুতিক আলো ছিল না। ছিল না রাস্তার ল্যাম্প পোস্ট। আলো জ্বালানোর একমাত্র ভর্ষা ছিল আগুন আর মোমবাতি। আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে কেঁপে উঠতো চারপাশ। মানুষ ভাবতো সৃষ্টিকর্তা রেগে গেছেন। কিন্তু আকাশে এই বিদ্যুৎ কেন তৈরি হয় তা কেউ জানত না।
ঠিক সেই সময় প্রাচীন গ্রিসে এক দার্শনিকের হাতে এলো এক টুকরো হলুদ পাথর। তিনি পাথরটা নিয়ে এমন এক অদ্ভুত ঘটনা দেখলেন যা হয়তো তিনিও কল্পনা করেননি। দার্শনিকটির নাম থেলিস। আর সেই ছোট্ট পাথর থেকেই শুরু হয়েছিল বিদ্যুতের রহস্য উন্মোচনের এক দীর্ঘ যাত্রা। পাথরটার নাম অ্যাম্বার। কোটি কোটি বছর আগে গাছের আঠা জমে তৈরি হয়েছিল এই পাথর।
থেলিস পাথরটাকে পশমে ঘষতেই ঘটলো অদ্ভুত এক ঘটনা। পাথরটা নিজে থেকেই ছোট ছোট খরকুটো আর পালককে টেনে নিতে শুরু করল। কিন্তু কিভাবে? কোন হাত নেই, সুতো নেই তবুও একটা অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে। যে রহস্যকে মানুষ একসময় জাদু ভাবতো তার মধ্যেই লুকিয়েছিল বিদ্যুতের বিজ্ঞানের সূত্রপাত।
গ্রিক ভাষায় অ্যাম্বারকে বলা হতো ইলেকট্রন। এই শব্দ থেকেই এসেছে আজকের পরিচিত শব্দ ইলেকট্রিসিটি। মজার বিষয় হলো বিদ্যুৎ নিয়ে সবচেয়ে অদ্ভুত আবিষ্কারগুলোর একটা এসেছিল সম্পূর্ণ দুর্ঘটনাক্রমে।
1675 সালে ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী জ পিকার্ড রাতের অন্ধকারে পারদ ভর্তি একটা ব্যারোমিটার নিয়ে হাঁটছেন প্যারিস অবজারভেটরি থেকে। পারদ নলের ভেতরে দুলছে। আর হঠাৎ কাচের গায়ে ঝিলিক দিয়ে উঠলো এক ক্ষীণ আলো। চারপাশে আগুন নেই। মোমবাতিও নেই। তবুও আলো জ্বলছে কাচের ভেতরে। কিন্তু কোথা থেকে আসছে এই আলো পিকার্ড নিজেও বুঝতে পারলেন না।
খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে শুরু হলো কৌতূহল। এডিসনের বৈদ্যুতিক বাল্ব আবিষ্কারের প্রায় 200 বছর আগেই মানুষ কাচের ভেতরে আলো দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু সেই আলোর আসল রহস্য তখনও কেউ জানত না। তারপর 1705 সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হক্কসোবি ঠিক করলেন এই আলো তিনি ইচ্ছেমতো বানাবেন। বাতাস সরানো একটা কাচের গোলক দ্রুত ঘোরাচ্ছেন আর হাত দিয়ে ঘষছেন। আর ভেতরে জ্বলে উঠছে নীলচে আলো।
সে আলো এতটাই উজ্জ্বল যে সেই আলোয় বই পড়া যেত। রয়েল সোসাইটির ঘরে মোমবাতিতে অভ্যস্ত মানুষ সেই নীল আভা দেখে হতবাক। কিন্তু একটা সমস্যা এই বিদ্যুৎ যেখানে জন্মায় সেখানেই আটকে থাকে। তাকে এক ইঞ্চিও দূরে নেওয়ার উপায় নেই। তাহলে কি কাজে লাগবে সে? এই প্রশ্নের পেছনে লাগলেন ইংরেজ বিজ্ঞানী স্টিফেন গ্রে।
1729 সালে তিনি একটা কাচের নলে চার্জ বানিয়ে তার সঙ্গে জুড়ে দিলেন লম্বা এক সুতো। আর দেখলেন চার্জ সেই সুতো বেয়ে বহুদূর প্রায় 200 মিটার পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। পরের বছর তিনি এক কিশোরকে রেশমের দড়িতে ঝুলিয়ে চার্জ করে দেখালেন। ছেলেটার হাতের কাছে ছোট ছোট পাতা লাফিয়ে উঠছে। ভাবুন সেই দৃশ্য। শূন্যে ঝুলছে একটা ছেলে। আর তার শরীর থেকে বিদ্যুৎ টানছে পাতা।
এরপর গ্রে একের পর এক জিনিস পরীক্ষা করলেন। ধাতু আর ভেজা সুতোর ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ অনায়াসে চলে। কিন্তু রেশম, কাজ, রজন তাকে আটকে দেয়। এখান থেকেই এলো দুটো ধারণা। যা পরে পরিচিত হলো পরিবাহী আর অপরিবাহী নামে। যা আজও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রথম পাতায় থাকে।
টেলিগ্রাফ থেকে আজকের বিদ্যুৎ গ্রিড সবকিছু শুরু এখান থেকেই। এবার বিদ্যুৎকে দূরে পাঠানো গেল। কিন্তু আরেকটা সমস্যা তখনো ছিল এটাকে ধরে রাখা যাবে কিভাবে? কারণ বিদ্যুৎ তখন তৈরি হওয়া মাত্রই তা উবে যেত। 1745 থেকে 46 সালে প্রায় একই সময়ে দুই জায়গায় আলাদাভাবে এলো এর উত্তর। জার্মানির ফন্ট ক্লাইস্ট আর নেদারল্যান্ডসের লেইডেন শহরের পিটার ফর্ন মুসেনব্রু। দুজনেই বানালেন একই জিনিস।
পানি ভর্তি একটা কাচের বোতল যার ভেতরে ডোবানো ধাতুর তার। আর সেই বোতলের ভেতরে প্রথমবারের মতো বন্দি হলো বিদ্যুৎ। কিন্তু মুশেন ব্রুক নিজে সেটা পরীক্ষা করতে গিয়ে এমন শখ খেলেন ভয়ে তিনি বলেই দিলেন ফ্রান্সের পুরো রাজত্বের বিনিময়েও তিনি এই পরীক্ষা দ্বিতীয়বার করবেন না। এই বোতলের নাম লেইডেন যার।
আজকের ক্যাপাসিটর যার উত্তরসুরি আপনার মোবাইলের ভেতরেও আছে তার শুরু ওই বোতল থেকেই। খবর ছড়ালো ইউরোপ জুড়ে আর শুরু হলো উন্মাদনা। রাজদরবারে শত শত মানুষকে হাত ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে একসাথে বিদ্যুতের শখ দেওয়া হতো। মানুষ প্রথমবার টের পেল এই অদৃশ্য শক্তি আসলে কতটা জোরালো আর ঠিক এখান থেকেই বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের মাথায় এলো এক বিপদজনক প্রশ্ন। বোতলের এই ছোট ঝলক আর আকাশের ওই ভয়ঙ্কর বাজ দুটো মনে হয় একই জিনিস। তবে এই অনুমান তিনি প্রথম করেননি। তার আগেই ইউরোপের কয়েকজন বিজ্ঞানী একই কথা বলেছিলেন।
ফ্র্যাঙ্কলিনের আসল কৃতিত্ব ছিল অন্য জায়গায়। তিনি অনুমান করেই থেমে যাননি। তিনি এটা প্রমাণ করার একটা পরিকল্পনা করলেন। মজার ব্যাপার হলো সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ফ্রান্সে এক বিজ্ঞানী আগেই বাজ ধরে ফেলেছিলেন। কিন্তু সেই খবর তখনো আমেরিকায় পৌঁছায়নি।
1752 সাল ঝোড়ো আকাশে ফ্র্যাঙ্কলিন ওড়ালেন এক সিল্কের ঘুড়ি যার মাথায় বাঁধা একটা ধাতক তার। ঝড়ের মেঘের নিচে ঘুড়ি হাতে দাঁড়ানো মানে ছিল এক বিশাল জুয়া। তবে বাজ সরাসরি ঘুড়ির উপর পড়ুক এটা তিনি চাননি। তাহলে তিনি বাঁচতেন না। তার পরিকল্পনা ছিল সতর্ক। ঘুড়ির তার মেঘের সামান্য চার্জ ধরবে। ভেজা সুতো সেটা নিচে নামিয়ে আনবে। আর তার হাতের কাছের শুকনো রেশম তাকে বিপদ থেকে দূরে রাখবে। পরীক্ষা সফল হলো। তিনি একটা লেইডেঞ্জার চার্জ করলেন। দেখলেন ছোট ছোট স্পার্ক। প্রমাণ হলো আকাশের বিদ্যুৎ আর গবেষণাগারের বিদ্যুৎ একই শক্তি। কিন্তু বিপদ যে কতটা বাস্তব ছিল তা বোঝা গেল পরের বছরই।
রাশিয়ার বিজ্ঞানী গেম্যান বজ্র নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারালেন। ফ্র্যাঙ্কলিনের সতর্কতাই সেদিন তাকে বাঁচিয়েছিল। এই পরীক্ষা থেকেই জন্ম নিল লাইটনিং রড। একটা সাধারণ ধাতুর দণ্ড যা বাজের শক্তিকে নিরাপদে মাটিতে পৌঁছে দেয়। ফ্র্যাঙ্কলিনের জন্য কোন পেটেন্ট নেননি। তিনি চেয়েছিলেন সবাই যেন বিনা পয়সায় নিরাপদ থাকতে পারে। আজও পৃথিবীর প্রতিটা উঁচু ভবনে এই একই নীতি কাজ করছে।
যে আকাশকে মানুষ হাজার হাজার বছর শুধু ভয় পেয়েছে প্রথমবার তাকে বোঝা গেল। আর তার থেকে বাঁচার পথও মিলল।
এবার ফিরে যাই সেই ব্যাঙের কাছে যার কথা শুরুতে বলেছিলাম। 1780 সালের নভেম্বর ইতালি বিজ্ঞানী লুইজি গ্যালভানি একটা মরা ব্যাঙ কাটছেন। কাছেই চালু একটা ইলেকট্রোস্ট্যাটিক মেশিন। তার সহকারীর ছুরি ব্যাঙের পায়ের স্নায়ুতে ছুঁতেই পা লাফিয়ে উঠলো। অথচ ব্যাঙটা আগেই মরা। গ্যালভানি বছরের পর বছর এর পেছনে লেগে থাকলেন। শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন প্রতিটা জীবিত শরীরের ভেতরেই আছে নিজস্ব বিদ্যুৎ।
তিনি এর নাম দিলেন অ্যানিমাল ইলেকট্রিসিটি। কিন্তু আরেক ইতালীয় বিজ্ঞানী অ্যালেসান্দ্র ভোল্টা এটা মানতে পারলেন না। তার ধারণা রহস্যটা ব্যাঙের শরীরে নয়। রহস্যটা লুকিয়ে আছে পরীক্ষায় ব্যবহৃত দুটো আলাদা ধাতুর মধ্যে। মজার ব্যাপার হলো দুজনেই আংশিক ঠিক ছিলেন। কিন্তু সেই বিতর্কের ঝাঁজ থেকেই ভোলটা নেমে পড়লেন নিজের পরীক্ষায়। বছরের পর বছর ধাতু আর তরলের একটার পর একটা মিশ্রণ বাতিল করলেন।
অবশেষে 1800 সালে সাজালেন তামা আর দস্তার পাত। প্রতিটা স্তরের মাঝে নুন জলে ভেজানো কাপড়। এর নাম ভোল্টাই পাইল। এটাই ছিল পৃথিবীর প্রথম ব্যাটারি। আগের যন্ত্রগুলো শুধু এক মুহূর্তের জন্য বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারত। কিন্তু ভোল্টার ব্যাটারি বদলে দিল সবকিছু। প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা পেলেন একটানা বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ।
1801 সালে প্যারিসে নেপোলিয়নের সামনে নিজের আবিষ্কার তুলে ধরলেন ভোল্টার। তার কাজ দেখে মুগ্ধ হলেন সম্রাট। আর তাকে সম্মানিতও করলেন। এবার আর বারবার নতুন করে বিদ্যুৎ তৈরি করার দরকার ছিল না। বিজ্ঞানীদের হাতে চলে এসেছিল একটানা বিদ্যুৎ পাওয়ার নতুন উপায়।
1820 সাল ডেনমার্কের বিজ্ঞানী হান্স ক্রিস্টিয়ান ওরস্টেট পরীক্ষা দেখাচ্ছেন। একটা তারের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ চালাচ্ছেন। পাশে পড়ে আছে একটা সাধারণ কম্পাস। হঠাৎ কম্পাসের কাঁটা নড়ে উঠলো। সামান্য একটা কাঁটা নড়ল। কিন্তু এই ছোট্ট নড়াচড়াই বদলে দিল বিজ্ঞানীদের চিন্তাভাবনা।
এতদিন সবাই ভাবতেন বিদ্যুৎ আর চুম্বক সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জিনিস। কিন্তু সেদিন প্রথমবারের মতো দেখা গেল বিদ্যুতের সঙ্গে চুম্বকেরও সম্পর্ক রয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ইউরোপের বিজ্ঞানীরা নতুন উদ্দীপনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন নিজেদের গবেষণায়। কিন্তু একটা প্রশ্ন তখনো ঝুলেছিল। একটা তারের ভেতর দিয়ে ঠিক কতটা বিদ্যুৎ যাবে? জার্মান শিক্ষক জর্জ হোম বছরের পর বছর মেপে মেপে উত্তর বের করলেন। ভোল্টেজ বাড়লে কারেন্ট বাড়ে। রোধ বাড়লে কারেন্ট কমে। কি সহজ কথা। আর ঠিক এই সহজ হওয়াটাই ছিল তার সমস্যা।
1827 সালের সূত্রটা প্রকাশ হতেই অনেক বিজ্ঞানী একে বেশি সরল বলে হেসে উড়িয়ে দিলেন। হতাশ ওহোম শেষে শিক্ষকের চাকরিও ছেড়ে দিলেন। প্রায় এক দশকের বেশি পরে সব বিজ্ঞানী তাদের ভুল বুঝলেন কিন্তু সেই সম্মান তিনি পেয়েছিলেন অনেক দেরিতে। অথচ সেই সরল সূত্রই আজ প্রতিটা বৈদ্যুতিক যন্ত্রের নকশার প্রথম ধাপ।
এতদিনে একটা বড় প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছিল। বিদ্যুৎ দিয়ে যদি চুম্বক বানানো যায় তাহলে কি উল্টোটাও সম্ভব? চুম্বক দিয়ে বিদ্যুৎ? এই প্রশ্নের পেছনে লেগে থাকলেন [মিউজিক] ইংরেজ বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে। এক কামারের ছেলে যিনি কৈশরে কাজ করতেন বই বাঁধাইয়ের দোকানে। প্রায় কোন স্কুলের শিক্ষা ছাড়াই [মিউজিক] এক বিখ্যাত রসায়নবিদের সহকারী হয়ে তিনি ঢুকেছিলেন বিজ্ঞানের জগতে। বছরের পর বছর চুম্বক আর তারের কয়েল বারবার নতুন করে সাজালেন। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হলেন। অবশেষে 1831 সালের অক্টোবর মাসে তিনি দেখলেন এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। একটা চুম্বক কয়েলের কাছে নাড়াতেই পরিমাপক যন্ত্রে বিদ্যুতের উপস্থিতি ধরা পড়ল।
ভাবুন তো বছরের পর বছর চেষ্টা করার পর অবশেষে সেই যন্ত্রের কাঁটাটা নড়ে উঠলো। এই ছোট্ট নড়াচড়াই প্রমাণ করল শুধু ব্যাটারি নয় যান্ত্রিক শক্তি ব্যবহার করেও বিদ্যুৎ তৈরি করা সম্ভব। আর এটাই হয়ে উঠলো পৃথিবীর প্রতিটি জেনারেটরের মূলনীতি। থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট হোক, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা উইন্ড টারবাইন। সবকিছুর পেছনে রয়েছে সেই একই আবিষ্কারের ধারণা।
বিদ্যুৎ এবার বানানো যায়, দূরে পাঠানো যায়, ধরে রাখা যায় এমনকি নিজের ইচ্ছেমতো চালানো যায়। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর এখনো বাকি। কিভাবে এটা ঘরে ঘরে পৌঁছাবে? এই লড়াইয়ে মুখোমুখি হলেন দুইজন বিজ্ঞানী। একদিকে থমাস এডিসন যার নাম তখন পুরো আমেরিকায় পরিচিত আর অন্যদিকে নিকোলা টেসলা।
এক তরুণ অভিবাষী যিনি একসময় এডিসনের অধীনেই কাজ করতেন। এবার সেই দুজনই দাঁড়ালেন বিদ্যুতের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই ভিন্ন পথে। এডিসন গড়লেন ডিরেক্ট কারেন্ট মানে ডিসির ব্যবস্থা। 1882 সালে নিউইয়র্কের পার্ল স্ট্রিটে চালু হলো আমেরিকার প্রথম বাণিজ্যিক পাওয়ার স্টেশন। কিন্তু একটা বড় সমস্যা। ডিসি বিদ্যুৎ দূরে পাঠানো ছিল ব্যয়বহুল প্রায় অসম্ভব। ভোল্টেজ সহজে বদলানো যেত না। ফলে গ্রাহকদের থাকতে হতো পাওয়ার স্টেশনের একদম কাছে প্রায় এক মাইলের মধ্যে। টেসলা ভাবলেন অন্যভাবে। তিনি বিশ্বাস করতেন ভবিষ্যৎ অল্টারনেটিং কারেন্টের মানে এসির। ট্রান্সফর্মার দিয়ে এসির ভোল্টেজ সহজে বাড়ানো কমানো যেত। তাই উচ্চ ভোল্টেজে অনেক দূরে পাঠিয়ে পরে নামিয়ে আনা যেত। অপচয় হতো অনেক কম। টেসলা বানালেন এক কার্যকর এসি মোটরও। যা শুধু বিদ্যুৎ পরিবহন নয় যন্ত্র চালানো সম্ভব করল।
শিল্পপতি জর্জ ওয়েস্টিনহাউস কিনে নিলেন টেসলার পেটেন্ট। শুরু হলো ইতিহাসের সেই বিখ্যাত দ্বন্দ্ব। ওয়ার অফ দা কারেন্টস। এডিসনের হাতে ছিল নাম, প্রভাব আর প্রচার। তিনি জোরে সোরে বলতে লাগলেন এসি বিপদজনক। অন্যদিকে টেসলার হাতে ছিল শুধু একটা ধারণা আর ওয়েস্টিংহাউসের ব্যবসায়িক সাহস কিন্তু টেসলা হাল ছাড়লেন না। তার বিশ্বাস ছিল ভবিষ্যৎ তারই যে দূরত্বকে জয় করতে পারে।
1893 সাল শিকাগো ওয়ার্ল্ড ফেয়ার আলোকিত করল ওয়েস্টিং হাউসের এসি। লক্ষ লক্ষ মানুষ একসাথে দেখলেন রাতের অন্ধকার কিভাবে আলোয় ভরে যায়। তিন বছর পর 1896 সালে নায়াগ্রা জলপ্রপাত থেকে বাফেলো শহর পর্যন্ত সফলভাবে এসি বিদ্যুৎ পৌঁছে গেল। প্রমাণ হয়ে গেল বড় পরিসরে বিদ্যুৎ বিলি করার জন্য এসি সেরা। যার হাতে ছিল খ্যাতি তিনি জিতলেন না। জিতলো সেই ধারণা যা দূরত্বকে হারিয়ে দিতে পারত। আজও বিশ্বের বেশিরভাগ বিদ্যুৎ গ্রিড চলছে সেই একই নীতিতে।
থেলিসের অ্যাম্বার, পিকার্ডের ঝিলি, গ্রের সুতো, লেইডেনের বোতল, ফ্র্যাঙ্কলিনের ঘুড়ি, গ্যালভানির ব্যাঙ, ভোল্টার ব্যাটারি, ওরস্টেডের কম্পাস আর ফ্যারাডেড চুম্বক থেকে টেসলার এসি। প্রায় 2600 বছর।
এই গল্পে কোন একজন নায়ক নেই। প্রতিটা মানুষ আগের মানুষের রেখে যাওয়া সমস্যার একটুখানি সমাধান করে গেছে। নিজেও না জেনে এর কাজ কোথায় [মিউজিক] গিয়ে শেষ হবে।
আর সেই সমাধানগুলো একসাথে জুড়ে আজ আপনার ঘরের প্রতিটা সুইচ, প্রতিটা বাল্ব, প্রতিটা চার্জারের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে।
যে আকাশের আলো দেখে মানুষ একদিন আতঙ্কে থাকতো আজ সেই একই শক্তি আপনার পকেটের ফোনে ঘুমিয়ে আছে। বিদ্যুৎ ছাড়া আজ আমরা একটা দিনও কল্পনা করতে পারি না।
সব পোস্টে ফিরে যান